Ticker

6/recent/ticker-posts

জড় প্রকৃতির মৌলিক তত্ত্ব Nature




📚 শ্রীমদ্ভাগবত (৩য় স্কন্ধ, ষড়বিংশতি অধ্যায়)

■ জড় প্রকৃতির মৌলিক তত্ত্ব

✧═══════•❁❁❀❁❁•═══════✧

ভগবান কপিলদেব বললেন—
“হে মাতঃ! এখন আমি আপনার কাছে পরমতত্ত্বের বিভিন্ন বিভাগ বর্ণনা করব। এই জ্ঞান অর্জনের ফলে মানুষ জড় প্রকৃতির গুণের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারে। আত্ম-উপলব্ধির চরম পূর্ণতা হচ্ছে জ্ঞান। সেই জ্ঞানই হৃদয়ের আসক্তি-গ্রন্থিকে ছেদন করে মুক্তি দেয়।

পরমেশ্বর ভগবান হচ্ছেন অনাদি, জড় প্রকৃতির গুণের অতীত এবং জাগতিক অস্তিত্বেরও অতীত। তিনি সর্বত্র বিরাজমান—তাঁর স্ব-প্রকাশিত জ্যোতির দ্বারা সমগ্র সৃষ্টির পালন হয়। তাঁর লীলারূপে তিনি সূক্ষ্ম জড় প্রকৃতিকে গ্রহণ করেন, যা ত্রিগুণাত্মিকা ও শ্রীবিষ্ণুর সঙ্গে সম্পর্কিত।

জড় প্রকৃতি ত্রিগুণ দ্বারা বিচিত্রভাবে বিভক্ত হয়ে জীবসত্তাকে আবদ্ধ করে। জীব মোহগ্রস্ত হয়ে মনে করে—‘আমি কর্মফল ভোগকারী ও কর্মের কর্তা’। অথচ আত্মা স্বভাবত কর্মাতীত। কিন্তু অজ্ঞতা জীবকে বদ্ধ অবস্থায় ফেলে দেয়। এ কারণেই শরীর, ইন্দ্রিয় ও ইন্দ্রিয়-অধিষ্ঠাতা দেবতারা জড় প্রকৃতি থেকেই উদ্ভূত।”


দেবহূতি জিজ্ঞাসা করলেন—
“হে ভগবান! দয়া করে আপনি পুরুষ ও তাঁর শক্তির লক্ষণসমূহ ব্যাখ্যা করুন, যেহেতু প্রকট ও অপ্রকট উভয় সৃষ্টির কারণ তাঁরাই।”


ভগবান বললেন—
“তিন গুণের সমন্বিত অব্যক্ত রূপকে বলা হয় প্রধান এবং তার ব্যক্ত রূপ হলো প্রকৃতি। প্রকৃতি গঠিত—

  • পাঁচটি স্থূল উপাদান: ভূমি, জল, অগ্নি, বায়ু ও আকাশ
  • পাঁচটি সূক্ষ্ম উপাদান: গন্ধ, রস, রূপ, স্পর্শ ও শব্দ
  • পাঁচ জ্ঞানেন্দ্রিয়, পাঁচ কর্মেন্দ্রিয় ও চার অন্তঃকরণ: মন, বুদ্ধি, অহঙ্কার ও চিত্ত

এই সমষ্টিই সগুণ ব্রহ্ম। সময় বা কাল এদের সমন্বয় সাধন করে। জড় প্রকৃতির সংস্পর্শে এসে জীব অহঙ্কারে আচ্ছন্ন হয় এবং মৃত্যুভয়ে আবদ্ধ হয়।

ভগবানই কালরূপে প্রকৃতিকে উদ্দীপিত করেন। তাঁর প্রভাবে প্রকৃতি মহত্তত্ত্ব প্রসব করে। মহত্তত্ত্ব থেকে অহঙ্কারের উদ্ভব হয় এবং অহঙ্কার তিন প্রকার—
১. বৈকারিক (সত্ত্ব-প্রধান)
২. তৈজস (রজ-প্রধান)
৩. তামস (তম-প্রধান)

এগুলো থেকেই মন, ইন্দ্রিয় ও পঞ্চভূতের ক্রমোৎপত্তি ঘটে।

  • বৈকারিক অহঙ্কার → মন (অনিরুদ্ধের অধীন)
  • তৈজস অহঙ্কার → বুদ্ধি, জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়
  • তামস অহঙ্কার → শব্দতন্মাত্র → আকাশ → শ্রবণেন্দ্রিয়
    → স্পর্শতন্মাত্র → বায়ু → স্পর্শেন্দ্রিয়
    → রূপতন্মাত্র → অগ্নি → দর্শনেন্দ্রিয়
    → রসতন্মাত্র → জল → রসনেন্দ্রিয়
    → গন্ধতন্মাত্র → ভূমি → ঘ্রাণেন্দ্রিয়

এইভাবে পরমেশ্বরের প্রভাবে ধীরে ধীরে সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ড বিকশিত হয়।


বিরাট পুরুষের প্রকাশ
ব্রহ্মাণ্ড এক অচেতন অণ্ডরূপে প্রকাশিত হলে, ভগবান তাতে প্রবেশ করে বিরাট পুরুষ রূপে আবির্ভূত হন। তাঁর দেহ থেকে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন অঙ্গ ও ইন্দ্রিয় প্রকাশিত হয়, এবং সেই সঙ্গে তাদের অধিষ্ঠাতা দেবতাগণ।

কিন্তু বিরাট পুরুষ তখনও নিদ্রিত ছিলেন। দেবতারা একে একে তাঁর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রবেশ করলেও তিনি জাগ্রত হলেন না। অবশেষে যখন চেতনার অধিষ্ঠাতা দেবতা তাঁর হৃদয়ে প্রবেশ করলেন, তখন বিরাট পুরুষ কারণজল থেকে উদিত হলেন।


উপসংহার
যেমন নিদ্রিত জীবকে জ্ঞানেন্দ্রিয়, কর্মেন্দ্রিয়, মন ও বুদ্ধি জাগাতে পারে না, তেমনি সমগ্র বিশ্বও পরমাত্মার উপস্থিতি ব্যতীত জাগ্রত হয় না। তাই ভক্তি, বৈরাগ্য ও জ্ঞানের দ্বারা অন্তরে বিরাজমান পরমাত্মার ধ্যান করা উচিত, যদিও তিনি জড় শরীর থেকে ভিন্ন।


✨ চলবে...

─━⊱♡ আগামী পর্বে ♡⊰━─
●●● জড়া প্রকৃতির উপলব্ধি ●●●
┈┉━❀❈ হরে কৃষ্ণ ❈❀━┉┈


একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ