Ticker

6/recent/ticker-posts

অশ্বিনীকুমারদ্বয় পরিচয় এবং ব্রতমাহাত্ম্য Brater Bath

 


অশ্বিনীকুমারদ্বয় ব্রত


🌼 নামের তাৎপর্য 🌼

অশ্বিনী শব্দটি এসেছে "অশ্ব" থেকে—অর্থাৎ ঘোড়া। সূর্যপত্নী সংজ্ঞা একসময় অশ্বরূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন, এবং তাঁর অশ্বরূপ পুত্রদ্বয়ই হলেন অশ্বিনীকুমারদ্বয়
তাঁরা স্বর্গের বিখ্যাত চিকিৎসক দেবতা, দেবলোকের “বৈদ্য” রূপে পরিচিত।
পিতা সূর্যদেব, মাতা সংজ্ঞা দেবী
সূর্যের অপর নামও “অশ্বিনী”, তাই এঁদের নাম হয়েছে অশ্বিনীকুমার — সূর্যপুত্র যমজ দেবতা।


🌺 পারিবারিক পরিচয় 🌺

পিতা: সূর্যদেব
মাতা: সংজ্ঞা দেবী

সঙ্গিনী:

  • জ্যোতি দেবী (মানবদেহের দেবী, নাসত্যের পত্নী)
  • মায়ান্দ্রী (জাদুর দেবী, দস্রের পত্নী)

সন্তান:

  • সত্যবীর (নাসত্যের পুত্র, পুনরুদ্ধারের দেবতা)
  • দমরাজ (দস্রের পুত্র, পাতালদেবতা)
  • নকুল ও সহদেব (মাদ্রীর গর্ভজাত, অশ্বিনীকুমারদের আশীর্বাদে জন্মপ্রাপ্ত)

বাহন: সোনার রথ


🌞 পর্ব – ১ : বৈদিক যুগে অশ্বিনীকুমারদ্বয় 🌞

অশ্বিনীকুমারদ্বয় বা অশ্বিদ্বয় বৈদিক সাহিত্যে অতি প্রাচীন দেবতা।
ঋগ্বেদে তাঁদের উল্লেখ আছে ভিষক বা চিকিৎসক দেবতা হিসেবে।
সূর্যদেব ও সংজ্ঞা দেবীর অশ্বরূপ মিলনের ফলে এই যমজ পুত্রদ্বয়ের জন্ম হয়।
এই কারণেই তাঁদের বহু মূর্তিতে অশ্বমুখ দেবতা হিসেবে দেখা যায়।

তাঁদের মধ্যে অগ্রজ নাসত্য, অনুজ দস্র
সূর্যদেব ও সংজ্ঞার আর এক পুত্র রেবন্ত, যিনি অশ্বদের অধিপতি দেবতা।

মহাভারতে অশ্বিনীকুমারদ্বয় দেবচিকিৎসক হিসেবে বহুবার উল্লেখিত।
বিশেষত আদিপর্বের উপমন্যোপাখ্যানসম্ভবপর্ব-এ তাঁদের বর্ণনা পাওয়া যায়।
পাণ্ডুর দ্বিতীয়া পত্নী মাদ্রী তাঁদের অনুগ্রহে যমজ পুত্র নকুল ও সহদেব লাভ করেন,
যাঁরা আশ্বিনেয় নামে পরিচিত—পিতৃদেবতাদের অনুকরণে সুদর্শন ও অশ্ববীর্যবান।


🌙 পর্ব – ২ : সংজ্ঞা দেবীর অভিশাপ ও অশ্বিনীকুমার জন্ম 🌙

সূর্যের প্রখর তেজ সহ্য করতে না পেরে সংজ্ঞা দেবী চক্ষু নামিয়ে রাখতেন।
সূর্য ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে অভিশাপ দেন—যে তিনি এক “সংযমকারী” পুত্র প্রসব করবেন।
এই অভিশাপে জন্ম নেন যম
পরবর্তীতে সংজ্ঞার চঞ্চল দৃষ্টি দেখে সূর্য আরেক অভিশাপ দেন,
যার ফলে জন্ম নেন কন্যা যমী বা যমুনা

যম ও যমী জন্মের পর সংজ্ঞা দেবী নিজের প্রতিরূপ ছায়া সৃষ্টি করে
পুত্র-কন্যার দেখাশোনার দায় তার হাতে দিয়ে নিজ পিতৃগৃহে চলে যান।
পিতা বিশ্বকর্মা তাঁকে স্বামীর কাছে ফিরে যেতে বলেন,
কিন্তু তিনি না ফিরে ঘোটকীরূপ ধারণ করে উত্তর কুরুবর্ষে আশ্রয় নেন।

সূর্যদেব সব জানতে পেরে বিশ্বকর্মার কাছে যান,
নিজের তেজ হ্রাস করে অশ্বরূপ ধারণ করেন এবং ঘোটকী সংজ্ঞার সাথে মিলিত হন।
এই মিলনের ফলেই জন্ম নেয় দেবযমজ অশ্বিনীকুমারদ্বয়,
পরবর্তীকালে চিকিৎসাবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে তাঁরা পরিচিত হন “স্বর্গবৈদ্য” নামে।
তাঁদের রচিত গ্রন্থের নাম বলা হয় — চিকিৎসা সার তত্ত্ব


🔱 পর্ব – ৩ : সংজ্ঞার অভিশাপমুক্তি ও ব্রতের উৎপত্তি 🔱

অশ্বরূপ মিলনের পর সংজ্ঞা দেবী ভীত হয়ে দিকবিদিক ছুটতে লাগলেন।
তখন পিতা বিশ্বকর্মা পরামর্শ দিলেন—
“এর একমাত্র সমাধান জানেন মহাদেব।”

সংজ্ঞা দেবী মহাদেবের কাছে গিয়ে সব বললে তিনি বলেন,
“আমি পুরুষ, নারীগত বিষয়ে উপায় জানি না;
তুমি আমার অর্ধাঙ্গিনী পার্বতীর শরণ নাও।”

সংজ্ঞা দেবী দেবী পার্বতীর নিকট গিয়ে সমস্ত কাহিনি বললেন।
দেবী করুণাময়ী পার্বতী তাঁকে এক মুষ্টি চাল দিয়ে বললেন—

“আশ্বিন মাসের শেষ দিনে, পূর্ণরাত্রে এই চাল ভক্তিপূর্ণভাবে রান্না করে
মহাদেবের আরাধনা করবে।
পরদিন, কার্তিক মাসের প্রথম দিনে সেই অন্ন ভক্ষণ করলে
তোমার সমস্ত দুঃখ ও অভিশাপ দূর হবে,
মনোবাসনা পূর্ণ হবে।”

সংজ্ঞা দেবী সেই নির্দেশ পালন করে রোগ ও অভিশাপমুক্ত হলেন।
সেই থেকেই প্রচলিত হলো —

‘আশ্বিনে রাঁধে, কার্তিকে খায়,
যে বর মাগে, সেই বর পায়।’

তাই আজও এই তিথিতে পালিত হয় অশ্বিনীকুমারদ্বয় ব্রত,
যা স্বাস্থ্য, সৌভাগ্য ও মনোকামনা পূরণের প্রতীক।


🌾 ব্রতের ভাতের পূজা 🌾

এই ব্রতে রান্না করা ভাত ও অন্নই মূল উপাচার।
আশ্বিন মাসের শেষ দিনে এক মুষ্টি চাল ভক্তিপূর্বক রন্ধন করে
মহাদেব ও দেবী পার্বতীর পূজা করা হয়,
এবং পরের দিন কার্তিকের প্রথম প্রভাতে সেই অন্ন ভক্ষণে
মনস্কামনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস।

সংজ্ঞা দেবীর অভিশাপমুক্তির স্মরণে আজও এই অশ্বিনীকুমারদ্বয় ব্রত
অত্যন্ত ভক্তিপূর্ণভাবে পালন করা হয়।


🌼 জয় হর-পার্বতীর জয়
🌼 জয় অশ্বিনীকুমারদ্বয়ের জয়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ