অনলাইন গীতা ক্লাস – পর্ব ১৫
শ্রীমদ্ভগবদ্গীতার মঙ্গলাচরণ
ওঁ অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন-শলাকয়া।চক্ষুরুন্মীলিতং যেন তস্মৈ শ্রীগুরবে নমঃ।।
অর্থ: অজ্ঞতার গভীর অন্ধকারে আমি নিমজ্জিত ছিলাম। গুরুদেব জ্ঞানের অঞ্জনের দ্বারা সেই অন্ধকার দূর করে আমার জ্ঞানচক্ষু উন্মুক্ত করেছেন। সেই শ্রীগুরুকে আমি প্রণাম জানাই।
🙏 নিজ নিজ গুরুদেবের প্রণাম-মন্ত্র পাঠ করুন 🙏
বাঞ্ছা-कल्प-তরুভ্যশ্চ কৃপা-সিন্ধুভ্য এব চ।পতিতানাং পাবনেব্যো বৈষ্ণবেব্যো নমো নমঃ।।
অর্থ: যাঁরা মনোবাঞ্ছা পূরণকারী, করুণার সাগর এবং পতিত আত্মাদের পরিত্রাতা—সেই সকল বৈষ্ণব ভক্তদের প্রতি আমার বারংবার প্রণাম।
মূকং করোতি বাচালং পঙ্গুং লঙ্ঘয়তে গিরিম্।যৎ কৃপা তমহং বন্দে পরমানন্দ মাধবম্।।
অর্থ: যাঁর কৃপায় বোবা বাকপটু হয় এবং পঙ্গুও পর্বত অতিক্রম করতে সক্ষম হয়—সেই পরমানন্দময় মাধবকে আমি বন্দনা করি।
হে কৃষ্ণ করুণাসিন্ধো দীনবন্ধো জগৎপতে।গোপেশ গোপিকাকান্ত রাধাকান্ত নমোস্তুতে।।
অর্থ: হে করুণাময় কৃষ্ণ! তুমি দীনবন্ধু, জগতের অধিপতি, গোপবৃন্দের প্রভু ও গোপীদের প্রিয়তম। হে রাধাকান্ত, তোমাকে আমার প্রণাম।
তপ্ত-কাঞ্চন-গৌরাঙ্গি রাধে বৃন্দাবনেশ্বরী।বৃষভানু-সুতে দেবি প্রণমামি হরিপ্রিয়ে।।
অর্থ: হে রাধারাণী! তপ্ত স্বর্ণের ন্যায় তোমার কান্তি। তুমি বৃন্দাবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী, রাজা বৃষভানুর কন্যা এবং ভগবান হরির পরম প্রিয়া। তোমাকে আমি শ্রদ্ধাভরে প্রণাম জানাই।
রামায় রামচন্দ্রায় রামভদ্রায় বেধসে,
রঘুনাথায় নাথায় সীতায়াঃ পতয়ে নম
শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য প্রভু নিত্যানন্দ।শ্রীঅদ্বৈত গদাধর শ্রীবাসাদি গৌরভক্তবৃন্দ।।
অর্থ: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, নিত্যানন্দ প্রভু, শ্রীঅদ্বৈত আচার্য, গদাধর, শ্রীবাস এবং সমগ্র গৌরভক্তবৃন্দের চরণে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম।
✨ মহামন্ত্র ✨
হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণকৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরেহরে রাম হরে রামরাম রাম হরে হরে 🙏
রামায়ণের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা
১. যেকোনো বিষয়ের তিনটি বিবেচ্য বিষয় রয়েছে, যথা:
- আবিষ্কার: কী বিষয়ে বলা হয়েছে? কী শুনলাম বা কী দেখলাম?
- উপলব্ধি: যা বলা হয়েছে, যা শুনলাম বা যা দেখলাম তা থেকে কতটুকু হৃদয়াঙ্গম করলাম।
- প্রয়োগ: ব্যবহারিক জীবনে প্রয়োগ।
২. সার্বজনীন মঙ্গলের জন্য ভাল বা মন্দ যাই করি, তা এ কাজের সাথে সম্পর্কিত সকলের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। তবে ব্যক্তিগত কোনো বিষয়ে গুরুর (পিতা-মাতা, শিক্ষাগুরু, দীক্ষাগুরু) সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কারণ আমরা চারটি ত্রুটি (ভ্রম, প্রমাদ, করুণাপটব, বিপ্রলিপ্সা) দ্বারা সীমাবদ্ধ। তাই আমাদের নিজের নেওয়া সিদ্ধান্তে ভুল হতে পারে। উদা: দশরথ মহারাজ শ্রীরামকে রাজা করার জন্য সভায় সবার অনুমতি নিয়েছিল।
৩. প্রতিজ্ঞা করা উচিত না। উদা: দশরথ-কৈকয়ী। তবে সদগুরুর নির্দেশে কোনো শাস্ত্রসম্মত ভগবানের সেবামূলক কাজের সংকল্প করা যেতে পারে। প্রতিজ্ঞা পালন করা ধর্ম। ধর্ম মানুষকে মুক্তি প্রদান করে, কোনো প্রতিজ্ঞা যদি বন্ধনের কারণ হয়, তবে সেই প্রতিজ্ঞা ভেঙে ফেলতে হবে। উদা: ভীষ্ম।
৪. নারীরা কোমল স্বভাবের হয়। কিন্তু কুসঙ্গ দোষে মারাত্মক কঠোর হতে পারে, যা দুঃখময় পরিবেশ তৈরি করে সবার জন্য। উদা: কৈকয়ী-মন্থরা।
৫. পিতৃসত্য পালনের জন্য রামের রাজ্য ত্যাগ করে বনে গমন, যা আমাদেরকে পিতা-মাতার সম্মান রক্ষা করার শিক্ষা দেয়।
৬. সীতাদেবীর রাজকীয় সুখ পরিহার করে শ্রীরামচন্দ্রের সাথে বনে গমন, যা পতিব্রতা নারীর বিলাসিতা ত্যাগ করে পতিদেবের সেবা ও অনুসরণের শিক্ষা দেয়।
৭. সেনাবাহিনী নিয়ে রামকে আনতে গেলে ভরতকে লক্ষ্মণের সন্দেহ থেকে শিক্ষা পাই যে, প্রকৃত তত্ত্ব না জেনে কাউকে সন্দেহ করা উচিত না।
৮. রাজা প্রজার সাথে না মিশলে প্রজার দুঃখ রাজা বুঝে না। তখন রাজা প্রজার মঙ্গল করতে পারে না। উদা: রামচন্দ্র ও যুধিষ্ঠির মহারাজের বনবাস।
৯. ভগবানের সেবা করতে হবে ভরতের রামচন্দ্রর সেবা করার মত। ভরতকে সারা পৃথিবীর লোকে নিন্দা করেছিল কিন্তু রামচন্দ্রের কাছে তিনি প্রিয় ছিল।
১০. ভগবানের ভক্তের সেবা করার মাধ্যমে ভক্তের কৃপায় ভগবান প্রাপ্তি হয়। উদা: সবোরী।
১১. যেকোনো ঘটনা ছোট রেখে সমাধান করাই উত্তম, বড় করা উচিত না। উদা: সুর্পণখা।
১২. বিপৎকালে বিপরীত বুদ্ধি সৃষ্টি হয়। তখন মনে হয় আমি যা করছি তা উত্তম, অন্যরা ভুল বলতেছে। উদা: রাবণকে সীতা হরণে বারণ করা।
১৩. এই জগতে অলৌকিক কিছু দেখা মানে সেটা মায়া। উদা: সীতাদেবীর মায়া হরিণ দেখা।
১৪. নারীদের চরণ ব্যতীত সর্বাঙ্গে কামদেব বিরাজমান। কোন সন্তান যখন মায়ের চরণের দিকে তাকায় তখন সেই সন্তানের মঙ্গল হয়। ১৪ বছর বনবাসকালে লক্ষ্মণ সীতাদেবীর শ্রীচরণ ব্যতীত অন্যকোন দিকে তাকায়নি।
১৫. সীতা অপহরণের আগে সীতাদেবী লক্ষ্মণকে কটু কথা বলেছিল, যার ফলে তাঁর বৈষ্ণব অপরাধ হয়েছিল। কারণ লক্ষ্মণ ছিল বলরাম এবং গুরুতত্ত্ব।
১৬. গুরুর আজ্ঞা ছাড়া কোনো কাজ করা উচিত নয়। ভাল কাজও যদি গুরুর আজ্ঞা ছাড়া করা হয়, তাহলে সেই কাজ থেকে ভয়ংকর পরিবেশের সৃষ্টি হতে পারে। যেমন ভিক্ষা দেওয়া ভাল কাজ। কিন্তু সীতাদেবী লক্ষ্মণের দিয়ে যাওয়া লক্ষ্মণ রেখা অতিক্রম করে রাবণকে ভিক্ষা দেওয়ায় সীতাদেবীর অপহরণ হয়েছিল।
১৭. সাধুর বেশ ধরে ভণ্ডামি করলে, অর্থ-ধন-সম্পদ, নারীদের সম্মান অপহরণ করলে তার কঠোর দণ্ড ভোগ করতে হবে। উদা: রাবণ, দুর্যোধন, দুঃশাসন।
১৮. নারীরা কখনো একলা নিরাপদ নয়। উদা: সীতাদেবীর অপহরণ।
১৯. ভগবান আমাদের পাশে থাকলেও আমাদের মায়ার দ্বারা প্রলোভিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। উদা: রামচন্দ্র-সীতাদেবী-স্বর্ণহরিণ।
২০. গুরুর প্রতি অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধার ফলে ভগবানও তাকে রক্ষা করতে পারে না। উদা: রামচন্দ্র-সীতাদেবী-স্বর্ণহরিণ-লক্ষ্মণ।
২১. কৃষ্ণভক্তিতে জাতি কুলাদি বিচার নেই। নিচ কুলে জন্মেও জটায়ু, সবোরী, হনুমান ভগবানকে পেয়েছে।
২২. ভগবান ও গুরুদেবের কাছে কিছু লুকানো উচিত নয়। উদা: হনুমান ছদ্মবেশে রামের সামনে যাওয়া।
২৩. ভগবানের চরণে কেউ শরণ নিলে তাকে ভগবান কখনো ত্যাগ করে না। উদা: রামের চরণে কাট্টা-সীতাদেবী।
২৪. হনুমানের ভগবানের সেবায় বাধা। # অনুকূল বাধা- মৈনাক পর্বত # প্রতিকূল বাধা- শুদ্ধিকা।
২৫. জাগতিক ভালোবাসা সত্য নয়। উদা: সাধু-অমর ফল-রাজা-রাণী-গোয়ালা-বেশ্যা-রাজা।
২৬. ভগবান থেকেও ভগবানের নাম বড়। উদা: রামনাম লিখা পাথর জলে ভাসে কিন্তু রামের হাতে দেওয়া পাথর জলে ডুবে যায়। ভগবান যাকে ত্যাগ করে তার দুর্গতির শেষ নেই।
২৭. নারদ মুিনর অভিশাপের কারণে সীতাদেবীর অপহরণ এবং রাবণের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছিল রামকে।
২৮. ভক্তের ক্ষুদ্র সেবায়ও ভগবান খুশি হন। উদা: রামচন্দ্র-সেতুবন্ধন-হনুমান-কাঠবিড়ালি।
২৯. ভগবানের সেবা করার জন্য মাঝে-মধ্যে মিথ্যা কথা বলতে হয়, ছলনার আশ্রয় নিতে হয়। উদা: বিভীষণ-রাম-রাবণ-মন্দোদরী, অশ্বত্থামা-হাতি-যুধিষ্ঠির।
৩০. পাপের ধন প্রায়শ্চিত্ত করতে চলে যাবে। উদা: শিব-দুর্গা-রাবণের দাদু বিশ্রবা মুনি-স্বর্ণলঙ্কা।
৩১. রাম-রাবণের যুদ্ধে নিহতদের পাহাড় দেখে সীতাদেবীর হৃদয়ে করুণা এবং ভগবানকে পরবর্তী লীলায় যাতে অস্ত্র না ধরেন।
৩২. রাবণের শেষ উপদেশ:
শুভস্য শীঘ্রম্ অশুভস্য কাল হরণম্।
অর্থাৎ শুভ কাজ তাড়াতাড়ি করতে হবে আর অশুভ কাজ কাল করব করব করে না করে কালকের জন্য ফেলে রাখতে হবে।



0 মন্তব্যসমূহ