মায়া কাকে বলে?
মায়া থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?
✨ মায়ার সংজ্ঞা
“মিয়তে অনয়ে ইতি মায়া”—অর্থাৎ যা আসলে সত্য নয়, অথচ মানুষ সেটিকেই সত্য ভেবে আসক্ত হয়, সেটাই মায়া।
মায়া হলো ভগবানের বহিরঙ্গ শক্তি, যা জীবকে জড়জগতে আবদ্ধ করে রাখে। এটি কেবল নারী বা স্ত্রী-লোক নয়; বরং বাড়ি, গাড়ি, টাকা-পয়সা, সম্পদ, ভোগ-বিলাস ইত্যাদি—যেকোনো কিছুর প্রতি অতিরিক্ত আসক্তিই মায়া।
মায়া মূলত মোহ। মানুষ যখন মনে করে সংসারের জিনিসপত্রই তাকে স্থায়ী সুখ দেবে, তখন সে মায়ার ফাঁদে পড়ে যায়। অথচ এগুলো সবই ছায়ার মতো—পিছনে ছুটলে ধরা যায় না।
✨ মায়ার স্বরূপ
ভগবানের প্রতি জীব কতটুকু শরণাগত—মায়া তারই পরীক্ষা নেয়। যেমন, কোনো রাজপ্রাসাদের দরজায় কুকুর প্রহরী থাকে। রাজা যখন কাউকে নিজের বলে গ্রহণ করেন, তখনই সেই প্রহরীরাও শ্রদ্ধা জানায়। তেমনি, ভগবানের কৃপা পেলে মায়া আর জীবকে আবদ্ধ রাখতে পারে না।
শাস্ত্রে বলা হয়েছে—
“কৃষ্ণ ভুলি যেই জীব অনাদি বহির্মুখ।
অতএব মায়া তারে দেয় সংসার দুঃখ॥”
(চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্যলীলা ২০/১১৭)
অর্থাৎ, জীব যখন শ্রীকৃষ্ণকে ভুলে যায়, তখন থেকেই সে জড়প্রকৃতির প্রতি আসক্ত হয়ে সংসারের দুঃখভোগ করে।
✨ মায়া থেকে মুক্তির উপায়
মায়া জয়ের একমাত্র পথ হলো শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ করা।
ভগবান শ্রীকৃষ্ণ গীতায় বলেছেন—
“দৈবী হ্যেষা গুণময়ী মম মায়া দুরত্যয়া।
মামেব যে প্রপদ্যন্তে মায়ামেতাং তরন্তি তে॥”
(ভগবদ্গীতা ৭/১৪)
অর্থাৎ, এই ত্রিগুণময় মায়া অতিক্রম করা খুবই কঠিন। কিন্তু যারা ভগবানের আশ্রয় গ্রহণ করে, তারাই একে অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।
✨ শাস্ত্রের প্রমাণ
📖 শ্রীমদ্ভাগবত (১/৭/৫) এ বলা হয়েছে—
“যয়া সম্মোহিতো জীব আত্মানং ত্রিগুণাত্মকম্।”
জীব যখন মায়াগ্রস্ত হয়, তখন সে আত্মাকে ত্রিগুণময় ভেবে বিভ্রান্ত হয়। কিন্তু হরিভজন করলে জীব গুণাতীত অবস্থায় পৌঁছে যায়।
📖 চৈতন্যচরিতামৃত (মধ্য ২২/৩১) এ শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন—
“কৃষ্ণ সূর্যসম, মায়া হয় অন্ধকার।
যাহা কৃষ্ণ, তাহা নাহি মায়ার অধিকার॥”
অর্থাৎ, সূর্যের আলো থাকলে অন্ধকার থাকতে পারে না; তেমনি কৃষ্ণভক্তি থাকলে জীবনের অন্ধকার—মায়া—দূর হয়ে যায়।
✨ চূড়ান্ত উপদেশ
যদি জীব ভগবান শ্রীকৃষ্ণের ভজন করে এবং গুরুদেবের সেবা গ্রহণ করে, তবে সে মায়াজাল থেকে মুক্ত হয়ে কৃষ্ণপাদপদ্ম লাভ করে।
“তাতে কৃষ্ণ ভজে, করে গুরুর সেবন।
মায়াজাল ছুটে, পায় কৃষ্ণের চরণ॥”
(চৈতন্যচরিতামৃত, মধ্য ২২/২৫)
🌼 সারসংক্ষেপ
🔹 মায়া মানেই মোহ ও আসক্তি, যা জীবকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
🔹 মায়া জয়ের একমাত্র পথ হলো শ্রীকৃষ্ণের শরণ গ্রহণ ও গুরুসেবন।
🔹 কৃষ্ণভক্তি অন্ধকার দূর করার মতো—যেখানে কৃষ্ণ আছেন, সেখানে মায়ার স্থান নেই।

0 মন্তব্যসমূহ