🌸 একাদশী উপবাসের দিন নির্ণয় ও দশমী বিদ্ধা একাদশী 🌸
একাদশী, জন্মাষ্টমী ইত্যাদি তিথিতে উপবাস পালন সনাতন ধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ বিধান। বৈদিক শাস্ত্রে প্রাচীনকাল থেকেই এসব ব্রতের নির্দেশ আছে। কিন্তু তিথি নির্ণয়ের পদ্ধতিতে বৈষ্ণব, শৈব, শাক্ত, স্মার্ত প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়, যার ফলে সাধারণ ভক্তদের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়।
বৈষ্ণব স্মৃতি কেন অনুসরণীয়
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিজে শ্রীল সনাতন গোস্বামীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, বিভিন্ন শাস্ত্রে বিক্ষিপ্তভাবে বর্ণিত বৈষ্ণব সিদ্ধান্তসমূহ সংগ্রহ করে “শ্রী হরিভক্তিবিলাস” নামে এক স্মৃতি গ্রন্থ সংকলন করতে। এই গ্রন্থে বৈষ্ণব আচরণ, ব্রত, উপবাস, পূজা ও সংস্কারের বিস্তারিত বিধান নির্ধারিত হয়েছে।
অন্যদিকে স্মার্ত পণ্ডিতগণ, যেমন শ্রীরঘুনন্দন ভট্টাচার্য বা কমলাকার ভট্ট রচিত অষ্টবিংশতি তত্ত্ব, নির্ণয় সিন্ধু ইত্যাদি গ্রন্থের উপর ভিত্তি করে অধিকাংশ প্রচলিত পঞ্জিকা প্রস্তুত হয়। ফলে একাদশী বা জন্মাষ্টমী নির্ধারণে বৈষ্ণব ও স্মার্তমতের মধ্যে ভিন্নতা দেখা যায়।
বৈষ্ণবরা শাস্ত্রের বিধান পালন করেন “কৃষ্ণ সন্তুষ্টির নিমিত্তে”, আর স্মার্তগণ তা করেন ধর্ম, অর্থ, কাম, মোক্ষ—এই চার পুরুষার্থের জন্য। তাই ব্রত নির্ণয়ে পার্থক্য স্বাভাবিক।
একাদশী তিথির দুই প্রকার
হরিভক্তিবিলাস (১২/১৯৯) অনুসারে একাদশীর দুটি রূপ রয়েছে—
১️⃣ শুদ্ধা বা সম্পূর্ণা একাদশী,
২️⃣ বিদ্ধা একাদশী।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব মতে, অরুণোদয় কালে যদি দশমী তিথি স্পর্শ করে, তবে সেই একাদশী “দশমী বিদ্ধা একাদশী” নামে পরিচিত এবং তা পালনযোগ্য নয়।
🔹 অরুণোদয় কী?
সূর্যোদয়ের প্রায় ১ ঘণ্টা ৩৬ মিনিট (৪ দণ্ড) আগে সময়কে অরুণোদয় বলা হয়।
যদি এই সময়ে দশমী তিথি থাকে, তবে ঐ দিন একাদশী পালন করা নিষিদ্ধ।
বিদ্ধা একাদশী বর্জনের শাস্ত্রীয় প্রমাণ
গরুড়পুরাণে বলা হয়েছে—
“সূর্যোদয়ের পূর্বে দুই মুহূর্তব্যাপী (৯৬ মিনিট) একাদশী থাকলে সেটি ‘সম্পূর্ণা একাদশী’। সেই দিনেই উপবাস করাই বিধেয়।”
ভবিষ্যপুরাণে বলা আছে—
“অরুণোদয়ে দশমী যদি একাদশীর সঙ্গে যুক্ত হয়, বৈষ্ণবের পক্ষে তা সর্বদা পরিত্যাজ্য।”
পদ্মপুরাণেও নির্দেশ—
“অরুণোদয়ে দশমী মিশ্রিত থাকলে, তা ত্যাগ করে পরের শুদ্ধা দ্বাদশীতে উপবাস করতে হবে।”
অর্থাৎ—যে একাদশী অরুণোদয়ে দশমী স্পর্শ করে, তা পাপফলদায়ী; সেই দিন নয়, পরদিন দ্বাদশী সংযুক্তা একাদশীতে ব্রত পালনই বৈষ্ণবের কর্তব্য।
ইসকন ও বৈষ্ণব পঞ্জিকা
প্রচলিত অনেক পঞ্জিকা স্মার্তমত অনুযায়ী লেখা হওয়ায় সেখানে দশমী বিদ্ধা একাদশীতেও উপবাসের উল্লেখ থাকে। কিন্তু ইসকনসহ গৌড়ীয় বৈষ্ণব পরম্পরা কেবল শুদ্ধা (অবিদ্ধা) একাদশীই পালন করে। এজন্য ইসকন প্রকাশিত বৈষ্ণব পঞ্জিকাই বৈষ্ণবদের জন্য প্রামাণিক বলে গণ্য।
বিদ্ধা একাদশী পালন করলে ফল
গরুড়পুরাণে বলা আছে—
“দশমীযুক্ত একাদশীতে অসুর সন্নিহিত থাকে, দ্বাদশীযুক্ত একাদশীতে হরি বিরাজমান। দশমী বিদ্ধা একাদশীতে উপবাস করলে পাপফল হয়।”
অতএব, শুদ্ধা বা দ্বাদশীযুক্ত একাদশীতেই উপবাস করা উচিত।
মহাদ্বাদশী ব্রত
কখনো শুদ্ধা একাদশী ত্যাগ করেও দ্বাদশীতে একাদশী ব্রত পালন করতে হয়।
স্কন্দপুরাণে বলা আছে—
“যখন একাদশী সম্পূর্ণ হয় এবং দ্বাদশীও পূর্ণ হয়, তখন শুদ্ধ একাদশী ত্যাগ করে দ্বাদশীতে উপবাস করতে হবে।”
এমন আট প্রকার দ্বাদশীকে বলা হয় অষ্টমহাদ্বাদশী—
উন্মীলনী, ব্যঞ্জলী, ত্রিস্পৃশা, পক্ষবর্ধিনী, জয়া, বিজয়া, জয়ন্তী, পাপনাশিনী।
এগুলো তিথি ও নক্ষত্রের বিশেষ যোগে সংঘটিত হয় এবং অত্যন্ত পবিত্র ও সর্বপাপহর।
উপসংহার
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু বলেছেন—
“একাদশীতে অরুণোদয় বিদ্ধা ত্যাগ, অন্য ব্রতে সূর্যোদয় বিদ্ধা ত্যাগ করে অবিদ্ধা ব্রত পালনেই ভক্তি হয়।”
(চৈ.চ. মধ্য. ২৪/৩৩৭)
অতএব, আত্মকল্যাণ ও ভগবৎপ্রসাদের জন্য প্রত্যেক ভক্তের কর্তব্য হলো—
শুদ্ধা বা দ্বাদশীযুক্ত একাদশী পালন করা,
এবং দশমী বিদ্ধা একাদশী সর্বতোভাবে বর্জন করা।
🌿 “যে শুদ্ধ একাদশীতে উপবাস করে, তার সমস্ত পাপ নাশ হয়; কিন্তু যে দশমী বিদ্ধা একাদশীতে উপবাস করে, সে পাপে নিমজ্জিত হয়।” —

0 মন্তব্যসমূহ