🌸 উত্থান একাদশীর মাহাত্ম্য
মহারাজ যুধিষ্ঠির বিনীতভাবে বললেন—
“হে পুরুষোত্তম! কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশীর নাম ও মাহাত্ম্য দয়া করে বলুন।”
শ্রীকৃষ্ণ উত্তর দিলেন—
“হে রাজন! কার্তিক মাসের শুক্লপক্ষের একাদশী ‘উত্থান একাদশী’ বা ‘প্রবোধিনী একাদশী’ নামে প্রসিদ্ধ। প্রজাপতি ব্রহ্মা একসময় দেবর্ষি নারদের নিকট এ একাদশীর গৌরব বর্ণনা করেছিলেন; আজ আমি তোমাকে সেই কথাই বলছি।”
🌿 ব্রহ্মা ও নারদের সংলাপ
নারদ মুনি বললেন—
“হে পিতামহ! যে দিনে ভগবান শ্রী গোবিন্দ শয়ন থেকে জাগ্রত হন, সেই একাদশীর মাহাত্ম্য দয়া করে সবিস্তারে বলুন।”
ব্রহ্মা বললেন—
“হে নারদ! উত্থান একাদশী সত্যিই মহাপবিত্র, পাপনাশিনী ও মুক্তিদায়িনী। এই ব্রত নিষ্ঠা সহকারে পালন করলে এক হাজার অশ্বমেধ যজ্ঞ এবং শত শত রাজসূয় যজ্ঞের ফল লাভ হয়। জগতে যে বস্তু দুর্লভ, তাও সহজে প্রাপ্ত হয়।
এই ব্রতের প্রভাবে জীবনের সকল দুঃখ ও পাপ বিলীন হয়, এবং ভক্তি, ঐশ্বর্য, প্রজ্ঞা ও সুখ লাভ হয়। যারা এই দিনে রাত্রি জাগরণ করেন, তাদের পাপ ভস্মীভূত হয়। মহান ঋষিগণ তপস্যা করে যে ফল অর্জন করেন, এই ব্রতের উপবাসে সেই ফল সহজে লাভ করা যায়।”
🌼 ব্রতের ফল ও মাহাত্ম্য
যারা উত্থান একাদশীতে ধ্যান করেন, তাদের পূর্বপুরুষগণ স্বর্গে সুখে অবস্থান করেন। এই ব্রতের ফলে ভয়ঙ্কর নরকযাত্রা থেকে মুক্তি ও বৈকুণ্ঠগতি লাভ হয়।
অশ্বমেধ যজ্ঞ বা তীর্থে স্বর্ণদানেও যে পুণ্য অর্জন কঠিন, এই ব্রতের রাত্রি জাগরণে তা অনায়াসে প্রাপ্ত হয়।
যিনি সঠিকভাবে এই ব্রত পালন করেন, তাঁর গৃহে সমস্ত তীর্থ এসে উপস্থিত হয়।
এই একাদশী ভগবান বিষ্ণুর অতি প্রিয়, এবং এর ফলে মানুষ জ্ঞান, তপস্যা ও মুক্তির সিদ্ধি লাভ করে। যিনি ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করেন, তাঁকে আর পুনর্জন্ম গ্রহণ করতে হয় না। মন ও বাক্যের পাপও শ্রী গোবিন্দের অর্চনায় বিনষ্ট হয়।
🔱 ব্রতের কর্তব্য
এই দিনে শ্রী জনার্দনের উদ্দেশ্যে স্নান, দান, জপ, কীর্তন ও হোম করলে অক্ষয় পুণ্য লাভ হয়।
চন্দ্র বা সূর্যগ্রহণে স্নান করলে যে পুণ্য হয়, তার সহস্রগুণ সুকৃতি এই ব্রতের রাত্রি জাগরণে লাভ হয়।
তীর্থযাত্রা, দান, জপ, ধ্যান প্রভৃতির ফল উত্থান একাদশী পালন না করলে নিষ্ফল হয়।
এই দিনে ভগবান হরির ভক্তি সহকারে পূজা না করলে শতজন্মের সঞ্চিত পুণ্যও ব্যর্থ হয়।
📖 শাস্ত্রপাঠ ও হরিকথার মাহাত্ম্য
যিনি কার্তিক মাসে ভাগবতাদি শাস্ত্র অধ্যয়ন করেন, তিনি সর্বপাপ মুক্ত হয়ে অসংখ্য যজ্ঞফল লাভ করেন।
ভগবান হরি ভক্তিসংলগ্ন শাস্ত্রপাঠে অত্যন্ত প্রীত হন—দানে বা যজ্ঞে তেমন নয়।
এই মাসে শ্রী বিষ্ণুর নাম, গুণ, রূপ, লীলা কীর্তন বা শ্রীমদ্ভাগবত পাঠ করলে শত শত গোদানের ফল অনায়াসে পাওয়া যায়।
অতএব, হে মুনিশ্রেষ্ঠ! কার্তিক মাসে সকল গৌণধর্ম ত্যাগ করে শ্রীকেশবের সম্মুখে ভক্তিসহ হরিকথা শ্রবণ ও কীর্তন করা কর্তব্য।
যিনি ভক্তসঙ্গে হরিকথা শ্রবণ করেন, তাঁর শতকুল উদ্ধার হয়, এবং হাজার দুগ্ধবতী গাভী দানের ফল লাভ হয়।
🌺 ভগবান সেবার মাহাত্ম্য
যিনি পবিত্রভাবে শ্রীকৃষ্ণের রূপ, গুণ ও লীলা শ্রবণ-কীর্তনে দিন যাপন করেন, তাঁর আর পুনর্জন্ম হয় না।
এই মাসে ফুল, ফল, অগুরু, কর্পূর ও চন্দন দ্বারা শ্রীহরির পূজা করা বিশেষ কর্তব্য।
সমস্ত তীর্থ ভ্রমণে যে পুণ্য হয়, তার কোটি গুণ পুণ্য লাভ হয় যদি উত্থান একাদশীতে শ্রীকৃষ্ণের চরণে অর্ঘ্য প্রদান করা হয়।
যারা নববিধা ভক্তির সাথে তুলসী সেবা করেন—তুলসী বীজ রোপণ, জলসেচন ইত্যাদি—তারা মুক্তিলাভ করে বৈকুণ্ঠে অধিষ্ঠিত হন।
🌿 তুলসী সেবার শ্রেষ্ঠ ফল
হে নারদ! সহস্র পুষ্পে দেবতার পূজা বা অসংখ্য যজ্ঞ ও দানেও যে ফল হয়,
এই মাসে হরিবাসরে একটিমাত্র তুলসী পাতা ভগবানের চরণকমলে অর্পণ করলে তার অনন্ত কোটি গুণ পুণ্য লাভ হয়।
🙏 উত্থান একাদশী তাই শুধু একটি উপবাস নয়, এটি ভক্তির জাগরণের দিন—
যেদিন ভগবান শ্রীহরি নিজে জাগ্রত হন, আর তাঁর সঙ্গে জাগে ভক্তের হৃদয়ে অমৃত-চেতনা। 🌼

0 মন্তব্যসমূহ