কার্তিক দেবতা : মন্ত্র, ধ্যান, পরিচিতি ও পুরাণকথা
কার্তিকের ধ্যান (ধ্যানমন্ত্র)
সংস্কৃত:
ওঁ কার্ত্তিকেয়ং মহাভাগং ময়ুরোপরিসংস্থিতম্।
তপ্তকাঞ্চনবর্ণाभং শক্তিহস্তং বরপ্রদম্।।
দ্বিভুজং শক্রহন্তারং নানালঙ্কারভূষিতম্।
প্রসন্নবদনং দেবং কুমারং পুত্রদায়কম্।।
অনুবাদ:
হে মহাভাগ কার্তিকদেব! আপনি ময়ূরের পিঠে অবস্থিত। তপ্ত সোনার মতো উজ্জ্বল আপনার রূপ। আপনার হাতে শক্তি অস্ত্র, আপনি বরদাতা। নানাবর্ণ অলংকারে ভূষিত। আপনি দেবশত্রুর বিনাশকারী, প্রসন্ন হাস্যময়, কুমাররূপে পুত্রদাতা দেবতা।
প্রণাম মন্ত্র
ওঁ কার্ত্তিকের মহাভাগ দৈত্যদর্পনিসূদন।
প্রণোতোহং মহাবাহো নমস্তে শিখিবাহন।
রুদ্রপুত্র নমস্ত্তভ্যং শক্তিহস্ত বরপ্রদ।
ষান্মাতুর মহাভাগ তারকান্তকর প্রভো।
মহাতপস্বী ভগবান্ পিতুর্মাতুঃ প্রিয় সদা।
দেবানাং যজ্ঞরক্ষার্থং জাতস্ত্বং গিরিশিখরে।
শৈলাত্মজায়াং ভবতে তুভ্যং নিত্যং নমো নমঃ।
অনুবাদ:
হে দেবসেনাপতি কার্তিক! দৈত্যদলনকারী, ময়ূরবাহন, আপনার প্রতি আমার প্রণাম। শিবের পুত্র, শক্তিধারী, বরদানকারী, ছয় কৃত্তিকার পালিত মহাভাগ দেবতা! আপনি তারকাসুর-বিনাশক, দেবযজ্ঞরক্ষার জন্য হিমালয়ের চূড়ায় জন্মগ্রহণ করেছেন। হে পার্বতীনন্দন, আপনাকে নিত্য প্রণাম।
কার্তিক দেবতার পরিচয়
কার্তিক বা কার্তিকেয় হিন্দুদের যুদ্ধদেবতা। শিব ও দুর্গার কনিষ্ঠ পুত্র, যদিও অনেক পুরাণে তাঁকে জ্যেষ্ঠও বলা হয়। বৈদিক যুগে তাঁর উল্লেখ কম, তবে পৌরাণিক যুগে তিনি সমগ্র ভারতবর্ষে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন।
তাঁর বহু নাম—
স্কন্দ, কুমার, ষড়ানন, গুহ, শিখিধ্বজ, কৃত্তিকাসূত, মহাসেন, সুব্রহ্মণ্য, মুরুগন, কার্তিকেয়, বিশাখ ইত্যাদি।
দক্ষিণ ভারতে তিনি বিশেষভাবে সম্মানিত। তামিলনাড়ুতে তিনি মুরুগন, কন্নড়-তেলুগুতে সুব্রহ্মণ্য, মালয়ালমে কন্দস্বামী নামে পরিচিত।
বাংলায় তাঁর পূজা হয় কার্তিক সংক্রান্তিতে ও দুর্গাপুজোর সময়ে।
কার্তিক ঠাকুর আসলে কে?
তিনি—
-
দেবতাদের সেনাপতি
-
যুদ্ধের দেবতা
-
শিব-দুর্গার পুত্র
-
তারকাসুর-বিনাশক
-
ছয় মাথাওয়ালা ষড়ানন কুমার
-
শক্তি, তীর-ধনুকধারী বীরযোদ্ধা
ষড়াননের অর্থ—ছয়টি মুখ। প্রতীক হিসেবে এর মাধ্যমে বোঝানো হয়—
পাঁচ ইন্দ্রিয় + একাগ্র মন = সর্বত্র সচেতনতা।
আবার অনেকে বলেন এই ছয় মুখ মানুষের ষড়রিপুর নিয়ন্ত্রণের প্রতীক:
কাম, ক্রোধ, লোভ, মদ, মোহ, মাত্সর্য।
কার্তিক দেবের জন্মকথা
কার্তিকের জন্ম মূলত তারকাসুরকে বধ করার নিমিত্তে।
সংক্ষেপে মূল কাহিনি:
-
সতীর দাহের পর শিব তপস্যায় লীন হন।
-
তারকাসুর বর পেয়েছিল—শিব-দুর্গার পুত্র ছাড়া তাকে কেউ মারতে পারবে না।
-
দেবতারা পার্বতীর জন্ম ও তপস্যার মাধ্যমে শিবকে সন্তুষ্ট করেন।
-
শিব-পার্বতীর যুগ্মতেজ এক অগ্নিপিণ্ড সৃষ্টি করে।
-
অগ্নিদেবও তা ধারণ করতে পারেন না—তিনি গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন।
-
সেই তেজ গঙ্গার মাধ্যমে ছয় কৃত্তিকার গর্ভে বিভক্ত হয়ে ষড়ানন কার্তিক জন্ম নেন।
-
পার্বতী তাঁকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন।
-
কৈশোরেই তিনি দেবসেনাপতি নিযুক্ত হন।
-
ষষ্ঠ দিনে তিনি তারকাসুরকে বধ করেন।
তারকাসুর মৃত্যুর আগে বর চান যাতে তিনি সর্বদা কার্তিকের সঙ্গেই থাকেন।
ফলে—
-
ময়ূর : তাঁর বাহন
-
মোরগ : পতাকা বা কুক্কুটধ্বজ
ময়ূর কেন কার্তিকের বাহন?
ময়ূর প্রতীক—
-
সতর্কতা
-
আলস্যহীন তৎপরতা
-
সৌন্দর্য ও শৌর্য
-
অহংবোধের জয় (ময়ূর সাপকে পদদলিত করে)
-
যোদ্ধার কর্মদক্ষতা
-
ক্লেশের মধ্যে উল্লাস (মেঘ দেখলে ময়ূরের নৃত্য)
সুতরাং কার্তিকের চরিত্রের সঙ্গে ময়ূর বিশেষভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নাম কার্তিক কেন?
-
তিনি কৃত্তিকা নক্ষত্রে জন্মেছেন।
-
ছয় কৃত্তিকা তাঁকে লালন করেছেন।
এই কারণে তাঁর নাম কার্তিক, কার্তিকেয় বা কৃত্তিকাসূত।
কেন পূজা করা হয় কার্তিকের?
১. তারকাসুর বিনাশ
দেবলোককে রক্ষা করেছিল তাঁর অপার বীরত্ব।
২. শক্তি ও ন্যায়রক্ষার দেবতা
তিনি শক্তির প্রতীক, আবার নম্র ও শান্ত স্বভাবের।
৩. দেবসেনাপতি
সকল দেবতার পক্ষ থেকে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেন।
৪. উর্বরতা ও পুত্রলাভের দেবতা
লোকবিশ্বাস—কার্তিকের ব্রত করলে সন্তানের সুখ লাভ হয়।
৫. সৌন্দর্য ও বীর্যশক্তির প্রতীক
অনেকে বলিষ্ঠ ও সুন্দর সন্তানের কামনায় পূজা করেন।
বাংলায় ও অন্যান্য অঞ্চলে পূজা
বাংলায় কার্তিক পূজা হয়—
-
কার্তিক সংক্রান্তিতে
-
দুর্গাপূজা উপলক্ষে
-
বিশেষ করে চুঁচুড়া-বাঁশবেরিয়া অঞ্চলে
-
প্রাচীন গৃহস্থবাড়িতে
-
বাংলার গণিকা সমাজে কার্তিক পূজা ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়
ওড়িশায়—
কুমার পূর্ণিমায় কুমারীরা কার্তিকের মতো স্বামী কামনা করে।
তামিলনাড়ু, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর—এ অঞ্চলে মুরুগন পূজা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কার্তিক পূজা ও পুত্রসন্তান কামনা
কার্তিককে উর্বরতার দেবতা ধরা হয়।
কথিত আছে—
দেবকী কার্তিক ব্রত করে খোদ শ্রীকৃষ্ণকে লাভ করেছিলেন।
লোকবিশ্বাস—
-
সুন্দর, বলিষ্ঠ সন্তান
-
পরিবারের মঙ্গল
-
রোগ-অশুভ দূরীকরণ
এর জন্য কার্তিক পূজা করা হয়।
কার্তিকের মতো স্বামী কামনা (ওড়িশার প্রচলন)
ওড়িশার কুমার পূর্ণিমায় অবিবাহিতা মেয়েরা কার্তিককে পূজা করেন তাঁর মতো—
-
বলিষ্ঠ
-
সুন্দর
-
বীর
-
নীতিবান
স্বামী লাভের জন্য।
উপসংহার
কার্তিক দেবতা বীরত্ব, ন্যায়, সততা ও শক্তির প্রতীক।
তাঁর জীবনী আমাদের শিখায়—
-
ইন্দ্রিয়জয়
-
অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
-
নম্রতা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ
-
কর্তব্যনিষ্ঠা
-
এবং জীবনযুদ্ধে সজাগ থাকা
কার্তিকের পূজা তাই শুধু ধর্মীয় আচার নয়, নৈতিকতা ও চরিত্রগঠনেরও এক আদর্শ শিক্ষা।

0 মন্তব্যসমূহ