🌸 সফলা একাদশীর মাহাত্ম্য 🌸
পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশী তিথির নাম সফলা একাদশী। ব্রহ্মাণ্ড পুরাণে যুধিষ্ঠির ও ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সংলাপে এই একাদশীর অপূর্ব মাহাত্ম্য বর্ণিত হয়েছে।
যুধিষ্ঠির মহারাজ ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে জিজ্ঞাসা করলেন—
“হে প্রভু, পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম কী, এর বিধি কী এবং কোন দেবতার পূজা এই তিথিতে সর্বাধিক ফলপ্রদ—দয়া করে তা বিস্তারিতভাবে বলুন।”
শ্রীকৃষ্ণ বললেন—
“হে রাজন, তোমার প্রতি স্নেহবশত আমি এই ব্রতের কথা বলছি। বহু দান-দক্ষিণা ও যজ্ঞের দ্বারা যেমন আমি সন্তুষ্ট হই, তার থেকেও অধিক সন্তুষ্ট হই একাদশী ব্রত পালনে। অতএব ভক্তিভরে এই ব্রত পালন করা কর্তব্য।
পৌষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের একাদশীর নাম সফলা। নাগদের মধ্যে যেমন শেষনাগ শ্রেষ্ঠ, পক্ষীদের মধ্যে গরুড়, মানুষের মধ্যে ব্রাহ্মণ এবং দেবতাদের মধ্যে নারায়ণ সর্বশ্রেষ্ঠ—তেমনই সকল ব্রতের মধ্যে একাদশী ব্রত সর্বশ্রেষ্ঠ। এই ব্রত পালনকারী আমার অত্যন্ত প্রিয়। তারা ইহলোকে ধন-সম্পদ লাভ করে এবং পরলোকে মুক্তিলাভ করে। সহস্র সহস্র বছর তপস্যা করেও যে ফল পাওয়া যায় না, সফলা একাদশীতে রাত্রি জাগরণ করলেই তা অনায়াসে লাভ হয়।”
শ্রীকৃষ্ণ এরপর একটি পবিত্র উপাখ্যান বললেন—
মহিষ্মত নামে এক রাজা চম্পাবতী নগরে রাজত্ব করতেন। তাঁর চার পুত্র ছিল। কিন্তু জ্যেষ্ঠপুত্র লুম্ভক ছিল অত্যন্ত দুষ্কর্মে লিপ্ত। সে পরস্ত্রীগমন, মদ্যপান ও নানা অসৎ কাজে সর্বদা রত থাকত। ব্রাহ্মণ, বৈষ্ণব ও দেবতাদের সে নিন্দা করত। পুত্রের এই দুরাচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজা তাকে রাজ্য থেকে নির্বাসিত করেন।
স্ত্রী-পুত্র, পিতা-মাতা ও আত্মীয়স্বজন সকলের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়ে লুম্ভক গভীর অরণ্যে আশ্রয় নেয়। সেখানে সে কখনও জীবহত্যা, কখনও চুরি করে জীবনধারণ করতে থাকে। একদিন নগরে প্রবেশ করলে প্রহরীদের হাতে ধরা পড়ে, কিন্তু রাজপুত্র হওয়ায় সে মুক্তি পায়। পুনরায় অরণ্যে ফিরে গিয়ে সে ফলমূল আহার ও শিকার করে জীবন কাটাতে থাকে।
সেই অরণ্যে বহু পুরাতন একটি বিরাট অশ্বত্থ বৃক্ষ ছিল। ভগবান শ্রীবাসুদেব সেখানে বিরাজ করেন বলে বৃক্ষটি দেবত্বপ্রাপ্ত ছিল। সেই পবিত্র বৃক্ষতলেই লুম্ভক বসবাস করত।
পূর্বজন্মের পুণ্যবলে একদিন পৌষ মাসের দশমী তিথিতে সে কেবল ফল আহার করে দিন অতিবাহিত করল। কিন্তু রাতে প্রচণ্ড শীতের কারণে সে প্রায় মৃতপ্রায় হয়ে পড়ল। পরদিন সূর্যোদয়ের পরও সে অচেতন অবস্থায় পড়ে রইল। দুপুরের দিকে চেতনা ফিরে এলে অতি কষ্টে কিছু ফল সংগ্রহ করে আবার সেই অশ্বত্থ বৃক্ষতলে এসে বিশ্রাম নিল।
রাত্রে ক্ষুধা ও দুর্বলতায় সে অত্যন্ত কাতর হয়ে পড়ে। প্রাণরক্ষার আশায় সে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে ফলগুলি হাতে নিয়ে অশ্রুসজল নয়নে বলল—
“হে ভগবান, আমার আর কী গতি আছে?”
এই বলে সে বৃক্ষমূলের কাছে ফল নিবেদন করে প্রার্থনা করল—
“হে লক্ষ্মীপতি নারায়ণ, আপনি প্রসন্ন হোন।”
এইভাবে সে অনাহারে ও অনিদ্রায় সেই রাত্রি অতিবাহিত করল।
ভগবান নারায়ণ লুম্ভকের এই রাত্রিজাগরণকে একাদশীর জাগরণরূপে এবং ফল নিবেদনকে পূজারূপে গ্রহণ করলেন। অজ্ঞাতসারেই লুম্ভকের সফলা একাদশী ব্রত সম্পন্ন হলো।
প্রভাতে আকাশ থেকে দৈববাণী শোনা গেল—
“হে পুত্র, সফলা একাদশীর পুণ্যপ্রভাবে তুমি রাজ্য লাভ করবে।”
এই দৈববাণী শোনামাত্র লুম্ভক দিব্যরূপ প্রাপ্ত হলো। তার সমস্ত পাপবুদ্ধি দূর হয়ে গেল। সে নিষ্কণ্টক রাজ্য লাভ করল। স্ত্রী-পুত্রসহ কিছুকাল রাজ্যসুখ ভোগ করে পরে পুত্রের হাতে রাজ্যভার অর্পণ করে সন্ন্যাস গ্রহণ করল। মৃত্যুকালে সে ভগবান নারায়ণের ধামে প্রত্যাবর্তন করল।
শ্রীকৃষ্ণ উপসংহারে বললেন—
“হে মহারাজ, এইভাবে যে ব্যক্তি সফলা একাদশী ব্রত পালন করে, সে ইহলোকে সুখ-সমৃদ্ধি এবং পরলোকে মুক্তিলাভ করে। যাঁরা শ্রদ্ধাভরে এই ব্রত পালন করেন, তাঁরাই ধন্য। তাঁদের জন্ম সার্থক—এতে কোনো সংশয় নেই। এই ব্রতের মাহাত্ম্য পাঠ ও শ্রবণ করলে রাজসূয় যজ্ঞের সমতুল্য ফল লাভ হয়।”

0 মন্তব্যসমূহ