Ticker

6/recent/ticker-posts

মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি Mokor Sonkranti

 



সবাইকে জানাই শুভ মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তির কৃষ্ণপ্রীতি শুভেচ্ছা ও আন্তরিক অভিনন্দন।

🌿 মকর সংক্রান্তি বা পৌষ সংক্রান্তি

মকর সংক্রান্তি শব্দের অর্থ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে মকর বলতে মকর রাশিকে বোঝানো হয়েছে এবং সংক্রান্তি শব্দের অর্থ সংক্রমণ বা প্রবেশ। অর্থাৎ সূর্যদেব যখন এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে প্রবেশ করেন, সেই সময়টিকেই সংক্রান্তি বলা হয়।

বৈদিক গণনা অনুযায়ী সময় বা কাল গণনা হয় মূলত দুইভাবে—
১) চন্দ্রমাস গণনা
২) সৌরমাস গণনা

সৌর গণনার সূচনা হয় সংক্রান্তির মাধ্যমে। সূর্য যে রাশিতে প্রবেশ করেন, সেই রাশির নামানুসারেই সংক্রান্তির নামকরণ হয়। মোট ১২ প্রকার সংক্রান্তি থাকলেও চারটি সংক্রান্তি বিশেষভাবে মাহাত্ম্যপূর্ণ—মেষ, কর্কট, তুলা ও মকর সংক্রান্তি।

মকর সংক্রান্তি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কারণ এই দিন থেকেই সূর্যদেব দক্ষিণায়ন ত্যাগ করে উত্তরায়ণ যাত্রা শুরু করেন। অর্থাৎ সূর্যের গতি দক্ষিণ দিক থেকে উত্তর দিকে পরিবর্তিত হয়। ছয় মাস সূর্য দক্ষিণায়নে অবস্থান করেন এবং পরবর্তী ছয় মাস উত্তরায়ণে।

এই উত্তরায়ণের মাহাত্ম্য সম্পর্কে ভগবদ্গীতার ৮/২৪ নং শ্লোকে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন—

অগ্নির্জ্যোতিরহঃ শুক্লঃ ষণ্মাসা উত্তরায়ণম্।
তত্র প্রয়াতা গচ্ছন্তি ব্রহ্ম ব্রহ্মবিদো জনাঃ।।

অনুবাদ:
যাঁরা ব্রহ্মজ্ঞ পুরুষ, তাঁরা অগ্নি, জ্যোতি, শুভ দিন, শুক্লপক্ষ এবং উত্তরায়ণকালে দেহত্যাগ করলে ব্রহ্মলাভ করেন।

অর্থাৎ মকর সংক্রান্তি থেকে শুরু করে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে যারা দেহত্যাগ করেন, তারা উচ্চলোকে গমন করেন; আর দক্ষিণায়ণে দেহত্যাগকারীরা নিম্নলোকে গমন করেন—এমন শাস্ত্রীয় ধারণা রয়েছে। মহাভারতে আমরা দেখি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও পিতামহ ভীষ্ম উত্তরায়ণের অপেক্ষা করে দেহত্যাগ করেছিলেন।

তবে শাস্ত্রে এও বলা হয়েছে—এই নিয়ম মূলত তাঁদের জন্য, যারা ভগবানের ভক্ত নন। যারা শ্রীকৃষ্ণের শরণাগত ও একনিষ্ঠ ভক্ত, তাঁদের জন্য উত্তরায়ণ বা দক্ষিণায়ণের কোনো ভেদ নেই। ভক্তরা যেকোনো সময়ে দেহত্যাগ করলেও তাঁদের গতি হয় কৃষ্ণলোকে, ভগবদ্ধামে। কারণ ভক্ত সর্বদাই ভগবানের স্মরণে নিবিষ্ট থাকেন। এ বিষয়ে ভগবদ্গীতার ৮/৫ নং শ্লোকে বলা হয়েছে—

অন্তকালে চ মামেব স্মরন্মুক্তা কলেবরম্।
যঃ প্রয়াতি স মদ্ভাবং যাতি নাস্ত্যত্র সংশয়ঃ।।

অনুবাদ:
মৃত্যুকালে যে ব্যক্তি আমাকে স্মরণ করে দেহত্যাগ করেন, তিনি নিশ্চিতভাবে আমার ভাবই প্রাপ্ত হন—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

আমাদের পৃথিবী এক বছরে সূর্যের চারদিকে একবার পরিক্রমা করে—এটাই এক সৌর বছর। কিন্তু দেবতাদের গণনা অনুযায়ী আমাদের এক বছর তাঁদের এক দিনের সমান। দেবতাদের দিনে ১২ ঘণ্টা দিন ও ১২ ঘণ্টা রাত। আমাদের ছয় মাস দেবতাদের ১২ ঘণ্টার সমতুল্য। দেবতাদের দিন শুরু হয় মকর সংক্রান্তির মাধ্যমে। এই সময় দেবতারা স্নান, দান ও ধ্যানসহ নানা পুণ্যকর্মে রত থাকেন। তাই এই দিনে মানুষ গঙ্গাস্নান, দান এবং ভগবানের উদ্দেশ্যে নানাবিধ পুণ্যকর্ম সম্পাদন করে।

এই সময় খল মাসের সমাপ্তি ঘটে এবং মঙ্গলমাসের সূচনা হয়। ফলে মকর সংক্রান্তি থেকেই সব শুভ ও মাঙ্গলিক কর্ম পুনরায় শুরু হয়।

মকর সংক্রান্তিতে ভগবানের উদ্দেশ্যে পিঠা, পায়েস, বিশেষত খিচুড়ি ভোগ নিবেদন করা হয়। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এই উৎসব ভিন্ন ভিন্ন রীতিতে উদ্‌যাপিত হয়—

  • উত্তর প্রদেশে খিচুড়ি উৎসব পালিত হয়।
  • গুজরাট ও রাজস্থানে ঘুড়ি উৎসব অত্যন্ত জনপ্রিয়।
  • অন্ধ্রপ্রদেশে তিন দিনব্যাপী উৎসব অনুষ্ঠিত হয়।
  • তামিলনাড়ুতে নতুন ধান দিয়ে দুধ-ঘি মিশিয়ে পোঙ্গল রান্না করা হয়।
  • মহারাষ্ট্রে তিলের লাড্ডু বিনিময়ের মাধ্যমে শুভেচ্ছা জানানো হয়।
  • পাঞ্জাবে আগের রাতে সাংস্কৃতিক উৎসব পালিত হয়।
  • পশ্চিমবঙ্গে গঙ্গাসাগর মেলা অনুষ্ঠিত হয় এবং গঙ্গাস্নান ও তর্পণ করা হয়।
  • বাংলাদেশে গ্রামবাংলায় পিঠা উৎসবের মাধ্যমে দিনটি উদ্‌যাপন করা হয়।

মকর সংক্রান্তি ঋতু পরিবর্তন ও নতুন ফসল ঘরে তোলার সময়। সূর্যের তেজ, দীপ্তি ও শক্তির সরাসরি প্রভাব এই সময় প্রকৃতিতে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়। সূর্যদেবের এই শুভ উত্তরায়ণ আমাদের জীবনেও নতুন আলো ও মঙ্গল বয়ে আনে।

সবশেষে, মকর সংক্রান্তির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন সূর্যদেব। ব্রহ্মসংহিতায় ব্রহ্মা বলেছেন—সূর্যদেব সমস্ত গ্রহের রাজা এবং তিনি ভগবানের চক্ষুরূপ। ভগবান গোবিন্দের আজ্ঞাতেই সূর্যদেব নিরবচ্ছিন্নভাবে তাঁর কর্তব্য পালন করে চলেছেন। এক নিষ্ঠাবান কর্মযোগীর মতো সূর্যদেব কখনো বিশ্রাম নেন না—নির্দিষ্ট সময়ে উদয় ও অস্তের মাধ্যমে তিনি সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডকে আলোকিত করে চলেছেন।

এই শুভ মকর সংক্রান্তিতে সূর্যদেবের কৃপা ও শ্রীকৃষ্ণের আশীর্বাদে সকলের জীবন হোক আলোকোজ্জ্বল ও মঙ্গলময়। 🌞🌾🙏

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ